“মানুষ সামাজিক জীব” কথাটা সহজ। কিন্তু একেই যদি বলা হয়, “Homo sapiens is a trans-spatial entity navigating the dialectics of socio-biological constructs,” তবে আমরা থমকে যাই। মনে হয় বিশাল গভীর কিছু বলা হলো, অথচ এর ভেতরে কোনো সারবস্তু নেই। Gordon Pennycook একেই বলেছেন ‘pseudo-profound bullshit’: অর্থহীন বাক্য, যা শুনতে গভীর মনে হয় [1]। মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা জটিল ভাষাকে তত্ত্বগত গভীরতা বলে ভুল করি। Harry Frankfurt তাঁর 'On Bullshit' বইয়ে একটি চমৎকার পার্থক্য করেছেন: একজন মিথ্যাবাদী অন্তত সত্যটা জানে এবং সেটাকে গোপন করার চেষ্টা করে; কিন্তু bulshitter-এর কাছে সত্য বা মিথ্যার কোনো গুরুত্ব নেই [4]। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হলো একটি বিশেষ ‘ইমপ্রেশন’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব তৈরি করা। যখন ভাষা যথেষ্ট জটিল হয়, তখন সেটিকে প্রশ্ন করার আগেই আমরা তার সামনে নতজানু হয়ে যাই। সহজভাবে বললে, না-বোঝাকেই গভীরতা বলে ধরে নেওয়ার এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতা আমাদের মধ্যে কাজ করে।
এই অস্পষ্টতার একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা কাঠামো আছে। জন সার্লের (John Searle) স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, মিশেল ফুকো একবার তাঁকে বলেছিলেন যে ফ্রান্সে অন্তত ১০ শতাংশ অস্পষ্টতা লেখায় রাখতে হয়, নইলে বুদ্ধিজীবী মহলে কেউ গুরুত্ব দেয় না [5]। একেই বলা হয় Obscurantism। এই কাঠামোগত সমস্যাটি একাডেমিয়াতে নির্লজ্জের মত প্রকট। Pierre Bourdieu যাকে cultural capital বলেছেন, সেখানে শব্দের কৃত্রিম জটিলতা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় [2]। এর চরম রূপ দেখা গিয়েছে Sokal Affair-এ, সম্পূর্ণ nonsense-এ ভরা একটি প্রবন্ধ কেবল গালভরা বুলি ও proper বৌদ্ধিক ভাষাভঙ্গির কারণে social text এর মত 'সম্মানজনক' জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল [3]। বর্তমান একাডেমিক ও সোশ্যাল মিডিয়া কাঠামো- যেখানে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বা ভাইরাল হওয়াটাই মুখ্য; সেখানে না দরকার মূল বিষয়ের বিশ্লেষণ, না প্রকৃত দর্শনের গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন। বর্তমান একাডেমিয়াতে জট পাকানো ভাষাই পাণ্ডিত্যের মাপকাঠি, সেখানে সহজ এবং স্বচ্ছ ভাষায় কঠিন কথা বলতে পারাটাই সবচাইতে বড় বৈপ্লবিক কাজ। কারণ ফর্ম বা শৈলীই মূল বিষয়বস্তুকে ছাড়িয়ে এক ধরনের স্টাইলিস্টিক পারফরম্যান্সে পরিণত হয় [6]।
বিশেষ করে আমাদের দেশীয় বৌদ্ধিক পরিসরে এই সংকট আরও জটিল, কারণ এখানে এক ধরনের অনুবাদ-নির্ভর আধিপত্য কাজ করে।
এসব দেখে আমার মনে পড়ে এক প্রাজ্ঞ অধ্যাপকের কথা- সামাজিক পরিমন্ডলে বিজ্ঞতার অভিনয় যত সফল হয়, সমাজ থেকে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা ততটাই ফুরিয়ে যায়।
শেষ করার আগে অস্তিত্বহীন implied পাঠকের কাছে একটি প্রশ্ন- আপনি কি সম্প্রতি এমন কোনো লেখা পড়েছেন যা পড়ার সময় আপনার মনে হয়েছে খুবই গভীর কিছু, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পরিষ্কার অর্থ খুঁজে পাননি? নাকি আপনিও মনে করেন সহজ ভাষায় কথা বললে লেখার ওজন কমে যায়?
References
[1] Pennycook, G., et al. (2015). On the reception and detection of pseudo-profound bullshit. Judgment and Decision Making, 10(6).
[2] Bourdieu, P. (1986). The Forms of Capital. In Handbook of Theory and Research for the Sociology of Education.
[3] Sokal, A. D. (1996). Transgressing the Boundaries: Toward a Transformative Hermeneutics of Quantum Gravity. Social Text, (46/47).
[4] Frankfurt, H. G. (2005). On Bullshit. Princeton University Press.
[5] Searle, J. R. (1994). Conversations with History: John R. Searle. Institute of International Studies, UC Berkeley.
[6] Edwards, M. A., & Roy, S. (2017). Academic Research in the 21st Century: Maintaining Scientific Integrity in a Hypercompetitive Culture. Environmental Engineering Science, 34(1).
But I wore the juice!
ডেভিড ডানিং আর জাস্টিন ক্রুগার দুজন সাইকোলজিস্ট ১৯৯৯ সালে একটি পেপার প্রকাশ করেন, "Unskilled and Unaware of It..." যেখান থেকে Dunning-Kruger Effect বলে একটি অদ্ভুত কিন্তু ভয়াবহ জিনিস সামনে আসে। আসল আলোচনায় যাওয়ার আগে এই স্টাডির পেছনের ঘটনাটা বলা দরকার কারণ ঘটনাটাই আসলে এই পুরো তত্ত্বটার জীবন্ত উদাহরণ।
ঘটনাটা ১৯৯৫ সালের। আমেরিকার পিটসবার্গের এক ভদ্রলোক, ম্যাকআর্থার হুইলার, একদিনে দুটো ব্যাংকে ডাকাতি করলেন তাও আবার কোনো ছদ্মবেশ ছাড়াই। শুধু তাই নয়, তিনি সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে পোজ পর্যন্ত দিলেন। পুলিশ যখন তাকে গ্রেপ্তার করলো তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন- 'But I wore the juice!"
প্রশ্ন হলো কিসের রস? উত্তর হলো লেবুর রস।
তার যুক্তি ছিল যেহেতু লেবুর রস দিয়ে অদৃশ্য কালি তৈরি করা যায়, তাই মুখে লেবুর রস মাখলে ক্যামেরার সামনেও তিনি অদৃশ্য হয়ে যাবেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ডাকাতির আগে তিনি পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে নিজের একটা ছবি তুলে পরীক্ষা করেছিলেন। ক্যামেরা ফোকাস না হওয়ায় ছবিটা ঝাপসা এসেছিল আর সেটাকেই তিনি প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন যে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এই ঘটনাটাই হলো ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট যেখানে অদক্ষ ব্যক্তিরা নিজের ভুল বুঝতে পারে না এবং নিজেদের দক্ষতাকে অনেক বাড়িয়ে দেখে। তারা এক ধরণের ডাবল বার্ডেন বহন করে- অদক্ষতা এবং সেই অদক্ষতা সম্পর্কে অজ্ঞতা।
এবার আসি আমার মূল পর্যবেক্ষণে। এই তত্ত্বটি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রছাত্রী, গবেষক এবং অধ্যাপকদের মধ্যে খুব প্রকটভাবে দেখা যায়। আগেই স্বীকার করে রাখি এই পর্যবেক্ষণ আংশিকভাবে anecdotal এবং এর মধ্যে confirmation bias থাকার সম্ভাবনাও আছে। তবুও যে প্যাটার্নটি দেখা যায় তা লক্ষ্য করার মতো। সবজায়গায়, without any exception, ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ্যক্রম নিজেকে একপ্রকার মাস্টার ডিসকোর্স হিসেবে জাহির করে যা মানুষের অস্তিত্ব, রাজনীতি থেকে ধর্মতত্ত্ব সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারে। অনেক শিক্ষার্থী যখন দেরিদা বা ফুকোর মতো জটিল তত্ত্বের প্রাথমিক পাঠ নেয় তখন তাদের মধ্যে এক ধরণের বিগিনার্স বাবল বা আত্মবিশ্বাসের বুদবুদ তৈরি হয়। সামান্য জানার পরেই তাদের আত্মবিশ্বাস প্রকৃত দক্ষতা বা বোঝার পরিধি ছাড়িয়ে যায় যাকে বলা হয় exhuberant and error-filled theorizing।
এই সর্বজ্ঞ-বিভ্রমের পেছনে কাজ করে প্রধানত দুটি বিষয়:
১। verbocentrism এবং epistemic hubirs: ইংরেজি সাহিত্যের আঙিনায় ভার্বোসেন্ট্রিজম প্রবলমাত্রায় বিদ্যমান। এখানে জটিল ভাষা এবং বিমূর্ত রূপক ব্যবহারের ক্ষমতাকেই বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত রূপ মনে করা হয়। এর ফলে জন্ম নেয় epistemic hubris; শিক্ষার্থীরা মনে করে জগতটাই যেহেতু একটা টেক্সট তাই টেক্সট অ্যানালাইসিসে তাদের ট্রেনিং থাকলে তারা রাজনীতি, দর্শন, বা ধর্মের মতো যেকোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার যোগ্য। এর জন্য তাদের কোনো বিশেষায়িত এম্পিরিকাল ডেটার প্রয়োজন নেই বলে তারা বিশ্বাস করে। ( ডোনা হ্যারাওয়ের god trick এর মতো।)
২। psycholgy in action: সাহিত্যের পাঠ্যক্রমকে প্রায়ই সাইকোলজি ইন অ্যাকশন হিসেবে তুলে ধরা হয় যেখানে ফিকশন পড়াকে সরাসরি মানবমনের গহীনের রহস্য উন্মোচন করার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। এই ফ্রেমওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের মনে ধারণা দেয় যে তারা শুধুমাত্র সাহিত্যের চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের মানসিক প্রক্রিয়া এবং আবেগের ব্যাপারে অথরিটি হয়ে উঠেছে। তারা মনে করে শুষ্ক বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে জগত সম্পর্কে গভীরতর সত্য তাদের কাছেই ধরা দিচ্ছে। ফলে তারা ধর্মতত্ত্ব থেকে শুরু করে জীবনের উদ্দেশ্য পর্যন্ত সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞসুলভ মন্তব্য করার অধিকারী বোধ করে।
এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে সাহিত্যের স্পাইরাল স্ট্রাকচার যা গভীরতার চেয়ে ব্যাপ্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ের টার্মিনোলজি শেখে কিন্তু সেই ভাষাগত fluencyকে তারা জ্ঞান বলে ভুল করে। এছাড়া গণিত বা quantitative দক্ষতার প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞাও এখানে কাজ করে যাকে অনেক সময় 'দার্শনিক অবস্থান' হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তা দক্ষতার অভাব ঢাকার একটি দুর্বল উপায় মাত্র। সাহিত্যের ব্যাখ্যায় ভুল অনেক সময় অ্যানাদার ইন্টারপ্রিটেশন হিসেবে ছাড় পেয়ে যায় যা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসকে বাস্তবসম্মতভাবে ক্যালিব্রেট হতে বাধা দেয়।
সবশেষে: ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের এই সবজান্তা হয়ে ওঠার পেছনে এক ধরণের ইনস্টিটিউশনাল ফিডব্যাক লুপ কাজ করে। তাত্ত্বিক ভাষা তাদের দেয় আত্মবিশ্বাসের বর্ম আর Pierre Bourdieu এর ভাষায় এই সাংস্কৃতিক পুঁজি তাদের সমাজে একটি বিশেষ মর্যাদা দেয় যা তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো আড়াল করে রাখে। ঠিক যেন ম্যাকআর্থার হুইলারের সেই লেবুর রস- আমরা মনে করি আমরা জ্ঞানের রস মেখেছি তাই আমাদের অদক্ষতা আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
পড়তে চাইলে-
১
২। The Dunning-Kruger Effect: On Being Ignorant of One's Own Ignorance
৩। Interdisciplinary Approach to Understanding Literary Texts - ERIC
৪। Overconfidence Among Beginners: Is a Little Learning a Dangerous Thing? - UNCW
৫। Epistemic hubris, iris.unisr.it
৬। The god trick and the idea of infinite, technological vision - Jill Walker Rettberg
৭। Cultural Capital Theory of Pierre Bourdieu - Simply Psychology
৮। The STEM/Humanities Divide and Student Defeatism - Blog of the APA
১১। Intellectualism, Anti-Intellectualism, and Epistemic Hubris in Red and Blue America
১২। Understanding Bourdieu's distinction: social and literary contestation to gain legitimate position
3
পুরোটাই 'আমার মতে...'
এক বিশেষ ধরণের এবং গড়নের (বিশেষত অধুনাতন কচিকবিদের) কবিতাগুলিতে প্রায়শঃই লক্ষ্য করছি এক ধরনের পরিকল্পিত বিমূর্ততা এবং সতর্ক অসম্পূর্ণতা—যা প্রথম দর্শনে উত্তরাধুনিকতাবাদী অভিব্যক্তির ভঙ্গিমা বলে ভ্রম হয়। কিন্তু গভীর পাঠে সেই বিমূর্ত চিত্র বা অসমাপ্ত বাক্যাংশগুলি অর্থবহতা বা আবেগের প্রকাশে আন্তরিকতার অভাবে অহরহ ভেঙে পড়ে। ভাষা ও চিত্রকল্প ব্যবহার করা হচ্ছে সে কথা সত্য; কিন্তু তার পেছনে যে অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার প্রয়োজন, তা সিংহভাগ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
এখানে ভাষা প্রতীকের আড়ালে সরে যায়, অথচ প্রতীকের ভিতর কোনও সুসম্বদ্ধ সংগতি থাকে না। কবিতার মধ্যে চিত্রগুলি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত না হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থিত থাকে, ফলে আমার মত মধ্যমেধার পাঠকের কাছে তা অস্পষ্ট নয়, বরং অকারণ ও অসংলগ্ন বলেই প্রতীয়মান হয়। এ ধরণের লেখায় ভাবগম্ভীরতা কৃত্রিম মনে হয়, কারণ কবিতায় আবেগ-আইডিয়া বা অভিজ্ঞতা নয়, বরং আধসেদ্ধ আত্মপ্রকাশের (কখনও বা অনর্থক তথ্যোপাত্তের) গুঁতোই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে পাঠকের মনে যে প্রশ্ন জাগে—এই বিমূর্ততা কি সত্যিই আন্তরিক, নাকি শুধুই একটি নান্দনিক ভান—তা অমীমাংসিত থেকে যায়। ভাষার অর্থবহ ব্যবহারের অভাবে এবং কাব্যদক্ষতার ঘাটতির কারণে, এই কবিতাগুলি আধুনিক কবিতার কাঠামোয় দাঁড়ালেও, তার অন্তর্গত বলিষ্ঠতা অনেকাংশেই প্রশ্নসাপেক্ষ থেকে যায়। যাই হোক, এই প্রবণতা কবির অভিব্যক্তির দুর্বলতা ঢাকার কৌশল হিসেবেও যথেষ্ট মাত্রায় বাণিজ্যসফল বটে।
পুনশ্চ: একদা এক কবি বলেছিলেন, "কবিতা কী সেটা তো কেউ ঠিক করে দেবে না!" উত্তরে আমি বলেছিলাম, ঘরের ছাদে কাক, আমি তো অবাক।