Story 1
Story 1
এই তো সেদিন বাজারে গিয়েছিলাম এটাসেটা কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে। বাজারে ঢোকার মুখে দেখা হলো তার সঙ্গে। তিনি আসলে আমার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যদিও যোগাযোগ বিশেষ রাখেন না এখন আর, তবু বাচ্চাবেলার বন্ধু তো! আজকাল
দেখলাম বেশ উদাস মুখে বসে আছেন চায়ের দোকানে। আমাকে দেখতে পেয়েও মনে হলো যেন চিনতে পারেনি। অগত্যা আমি এগিয়ে গেলাম ভদ্রলোকের দিকে। সামান্য খুক খুক আওয়াজ করে সামনে গিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, "আরে ভাই, কেমন আছো?" তাঁকে আবার 'ভাই' বলে সম্বোধন না করলে তিনি যারপরনাই বিরক্ত ফিল করেন। লোকাল লোকজন সবাই 'ভাই' বলেই ডাকে। শুনেছিলাম গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে চিঠি দেওয়ার সময় কোনো এক মেয়েও নাকি 'ভাই' ডেকে বেচারার মন ভেঙে দিয়েছিল। অবশ্য এসব কথা বদ লোকে বলে, আমি কান দিইনা এসবে।
আচ্ছা, আমি তো বলতেই ভুলে গেছি আসল ব্যাপারটা! তিনি আমাদের স্থানীয় উদীয়মান এক নেতাবিশেষ। ভদ্রলোক পড়াশোনা বিশেষ করেননি এমন কথা শতজন্মের শত্তুরেও বলবে না; তবে পড়াশোনার চেয়ে যে রাজনীতিতে বেশি ঝোঁক ছিল না এমনতর কথাও কোনো পরিচিত বা লোক বলবে বলে মনে হয় না। ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় সবাইকে পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবিতে স্কুলের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে অতি সত্ত্বর তিনি লোকাল কমিটির নেকনজরে পড়েন। তারপর আমাদের গঙ্গায় কত জল গড়ালো- লোকাল কমিটির পার্টি ক্ষমতায় এলো, ভদ্রলোক এক বিশিষ্ট হোমড়াচোমরা নেতা হয়ে এলাকায় জাঁকিয়ে বসলেন। কিন্তু তাঁর প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে বাদ সাধলেন সদ্যপতিত সরকারপক্ষের প্রাক্তন এমএলএ নিমাইবাবু। যশে-গৌরবে-প্রভাবে নিমাইবাবুর কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি এখনও তিনি। অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে তিনি ঠিক করলেন শত্রুর সঙ্গে মিত্রতা করাই শ্রেষ্ঠ পলিসি হবে। নিমাইবাবুর একমাত্র কন্যারত্ন তখন বিবাহযোগ্যা, সুতরাং বিকল্প খুঁজে আর বিশেষ লাভ ছিল না। নিমাইবাবুও ভাবলেন যে উদীয়মান নেতা যেহেতু, ভবিষ্যতে চাল-মুলো-কলা-ত্রিপল ঠিকই জুটে যাবে কপালে, রাজিও হয়ে গেলেন কন্যা সম্প্রদান করতে। মেয়েটিও ভারী মিষ্টি, দুই কুইন্টাল বপুখানার সঙ্গে ততোধিক বিরাট হৃদয়। সেই হৃদয়ের এক কোণে সায়নকেও আশ্রয় দিতে খুব একটা কার্পণ্য করলেন না ধনি। বিয়ের ডেটও ফাইনাল, আমাদের লোকাল নেতার নামে বিরাট আমবাগানের মালিকানা হস্তান্তর হবে হবে প্রায়, এমন সময়ে একদিন ঘটলো এক দুর্ঘটনা।
ব্যাপারটা আসলে খুবই তুচ্ছ, উল্লেখযোগ্য কিছুই নয়। হবু পশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আমবাগানে পায়চারি করছিলেন আমাদের নেতা। সাথে ছিলেন নিমাইবাবুর কন্যা। দুজনে মিলে পরিকল্পনা করছিল যে বাগানের সংস্কার করা যায় কীভাবে। আমাদের নেতা আবার একটু ধার্মিক টাইপের, পুজোআচ্চার ব্যাপারে প্রবল নিষ্ঠাবান। ছোট একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে সেখানে ছোট একটা মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বললেন নেতা, মেয়েটি তার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো, কিছুই বললো না। নেতা এক এক করে সব পরিকল্পনা শোনালেন।
মেয়েটি এতক্ষণ একটা দুটো কথা বলছিল, এর পর থেকে আর উত্তর এলো না কোনো। পরের দিনই আমাদের নেতার নামে লিগ্যাল নোটিস এলো, মেয়েটিকে নাকি ইমোশনালি হ্যারাস করেছে আমাদের নেতা। সাথে নিমাইবাবুর পক্ষ থেকে একটা কড়া চিঠি, তাতে তিনি কেবল দুটি শব্দ লিখেছেন, "বিবাহ বাতিল"।
ঘটনা এই অবধি আমাদের এলাকার সবাই জানে। আমিও জানতাম। চায়ের দোকানে বসে একটা দুটো সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে আমাদের নেতাসাহেব শেষে বলেই ফেললেন আসল দুঃখের কথাটা- বুঝলি প্রতাপ, আমি তো এখনও বুঝতে পারছি না যে আমার মধ্যে কি এমন কম আছে যে বিয়েটাই ভেঙে দিল!
আমি সামান্য ইতস্তত করে বলেই দিলাম ঘটনাটা। নিমাইবাবুর মেয়ে 'চান্স পেয়ে দেখা' ইউনিভার্সিটির পড়ুয়া, এসব কুসংস্কারে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। মন্দিরের কথা শুনেই হয়তো...
তাকিয়ে দেখি নেতার মুখ খোলা, মনে হলো চিবুক ঝুলে পড়েছে কোনো অবলম্বন না পেয়ে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে বাজারের দিকে হাঁটতে লাগলাম।