Story 3
Story 3
একদা এক গাঁয়ে শুকলাল এবং বাতাসী নামক দুই শিঙ্গি কপোত-কপোতীর ছোট্ট একটি কুটির ছিল। তাহাদের সম্পত্তি বলিতে কিছু না থাকিলেও, একে অপরের প্রতি প্রবলভাবে প্রণয়াপন্ন ছিল তারা। ঘরে বিরাট পালঙ্ক না থাকিলেও তাহাদের মনে দুঃখ ছিল না। এই প্রসঙ্গ উত্থাপিত হইলেই শুকলাল বলিত, "দ্যাখো, বিছানা নীচে থাকাই ভালো। ভেঙে যাবে, আওয়াজ হবে- এমন বিছানা লইয়া আমরা কী করিব?"
শুকলাল জ্ঞাত ছিল যে বাতাসীর বিবাহপূর্ব একাধিক জৃম্ভণ-সম্পর্ক বর্তমান ছিল, বাতাসীও শুকলালের সম্পর্কে এহেন অভিযোগ যে ইতিপূর্বে শ্রবণ করেনি, এমন নহে। কিন্তু অন্যান্য সকল পতিনিষ্ঠ পতিব্রতা স্ত্রীর মতন বাতাসীও শুকলালের সামান্য অনুকূলজ্যোতিদোষ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করেনি এতদিন। আর শুকলালও বাতাসীর ব্যায়বীয় রিরংসা লইয়া কোনো প্রশ্ন তুলিত না, পাছে বাতাসীর কোমল হৃদয় দুঃখভারাক্রান্ত হয়!
কিন্তু, যেহেতু প্রাবন্ধিক রবিকুমার ঠাকুর গেয়েছেন "চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়"- এই সুখী দম্পতির সুখের সংসারেও একদিন দুঃখের ঘন কালো ছায়া নেমে এলো। হঠাৎ গাঁয়ে এক উভয়ার্থে ধনী'র আগমন ঘটলো। তাঁর নাম ছিল হাওয়া বেগম। তিনি একখানি প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণ করিলেন, এবং অট্টালিকার নামকরণ করিলেন ওয়ো। বাতাসী বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে। শুকলালের মনে সামান্য আকর্ষণ আছে জেনে তাকে ওই অট্টালিকার নিকটবর্তী হইতে নিষেধ করলো বাতাসী। নিষিদ্ধ বস্তুতে যেমন আকর্ষণ বেশি হয়, একদিন শুকলাল ধেনু চড়াইতে চড়াইতে অট্টালিকার নিকটে গিয়া উপস্থিত হইলো। দেখিল বাহিরে লিপিবদ্ধ আছে " হে ক্লান্ত পথিক, ওয়োতে আপনাকে স্বাগতম। অভ্যন্তরে প্রবেশ করুন, অধিকতর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিবার সুযোগ হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিবেন না।"
এহেন সাদর আমন্ত্রণকে উপেক্ষা করিবার সাধ্য শুকলালের ছিল না। সে প্রবেশ করিল।
এর পর হইতে শুকলাল প্রতিনিয়ত একই দিকে যায়। গাভীগুলি পর্যাপ্ত ঘাস না পাইয়া রোদন করিতে থাকে। মাঝে মাঝে অট্টালিকার ভিতর হইতে স্বর্বর্ণের উচ্চারণ শুনিয়া বাহির প্রাঙ্গণে তাহারা হতবাক হইয়া একে অপরের মুখের পানে তাকাইয়া থাকে। বুঝিতে পারে না শব্দের উৎস কোথায়, কেনইবা এমন আওয়াজ শোনা যায় মাঝে মাঝে।
শুকলালের দেহ শুকিয়ে যায়, বাতাসী তাহাকে দুগ্ধাদি পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়াইবার চেষ্টা করে। কিন্তু খাবারের প্রতি শুকলাল মনোনিবেশ করিতে পারে না। তার চোখে কেবল ওয়োনিবাসের দূরবর্তী স্বপ্ন ভেসে যায়। শরীর ক্ষয়িত হতে থাকে, ওয়োনিবাসে হাওয়া বেগমের কাছ থেকে আতিথেয়তার সেবা গ্রহণের ক্ষমতাও হ্রাস পেতে থাকে ক্রমশ। এমন সময়ে একদিন ওয়োনিবাসে প্রবেশের সময়ে শুকলাল অবলোকন করে দরজায় আরো একজোড়া খড়ম, তার মন ভেঙে যায়। দুঃখে কষ্টে সে ঠিক করে যে আজ সে বাতাসীকে বাড়ি ফিরে সব সত্য জানাবেই।
অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ শুকলাল কিঞ্চিৎ পূর্বেই বাড়িতে ফিরে আসে। আপন কুটিরের নিকটে এসেই অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ায় শুকলাল। বাতাসীর শ্বাস থমকে আসা কন্ঠ শুনতে পায়, মনে হচ্ছে বাতাসী যেন তার বাবাকে কিছু একটা বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করতে করতে হাঁফিয়ে উঠছে। শুকলাল শ্বশুর মশায়ের সম্মানে গলা খাকারি দিয়ে ওঠে। বাতাসীর কন্ঠ থেমে যায়, কুটিরের পশ্চাদবাগে তালপাতার বেড়া ছিন্ন হওয়ার আওয়াজ আসে, দ্রুত পদচারনার আওয়াজ শুনতে পায় শুকলাল। সে ভাবে, "হয়তো শৃগাল হইবে"। বাতাসী অবিন্যস্ত কেশে হস্ত সঞ্চালন করতে করতে বাহির দুয়ারে এসে দাঁড়ায়। শুকলাল দেখে বাতাসীর পোশাকেও অজত্নের ছাপ। বাতাসী বলে, "এত শীঘ্র চলে এলে আজ! আমি মনে হয় ঘুমিয়ে কিছু স্বপ্ন দেখছিলাম গো!" শুকলাল সামান্য ভুলোমনা লোক, সে এতক্ষনে ভুলেই গিয়েছে বাড়িতে এসে বাতাসীকে কী কথা বলার ছিল তার। হস্তপদ প্রক্ষালনপূর্বক সে বাতাসীর অঙ্গমর্দনে রত হয়।
কিছুদিন পর হইতে দেখা হয় বাতাসীর শরীরেও দুর্বলতার সমূহ লক্ষণ বর্তমান। শুকলাল স্থানীয় জগতবিখ্যাত হেকিম পানুশেখকে ডাকিয়া আনিল। হেকিম মশাই বহুবার নাকচোখ উল্টেপাল্টে দেখে, নাড়ি টিপে, হাত দিয়ে বক্ষস্থলে হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করে অবশেষে দুজনের দিকে কটাক্ষ ক্ষেপন করে তীব্র ভর্ৎসনার সুরে একটাই বাক্য উচ্চারণ করলেন, "তোমাগো দুইজনের একই রোগ, শাস্ত্রে একে বলে অর্জিত প্রতিরক্ষার অভাবজনিত রোগলক্ষণসমষ্টি।"